ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৯ সেপ্টেম্বর ২০২১
  1. Games
  2. করোনাভাইরাস
  3. খেলাধুলা
  4. জাতীয়
  5. টেকনোলজি
  6. দুর্ঘটনা
  7. বিনোদন
  8. লাইফস্টাইল
  9. সফলতার গল্প
  10. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেধা পাচার! জাতীয় অগ্রগতির অন্তরায়

কালের পোস্ট ডেক্স
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১ ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ad

পবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। যাদের অধিকাংশই পড়াশোনা শেষ করে সেখানে চাকরিতে ঢুকে পরবর্তী সময়ে সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হয়ে যান। এতে করে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী হারাচ্ছে। সহজভাবে বলতে গেলে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অনেক মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা বাধাগ্রস্ত করছে আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে; একই সাথে আমরা হারাচ্ছি আমাদের দেশের মেধাবী, কৃতি সন্তানদেরকে।

বাংলাদেশ থেকে মেধা পাচারের নানাবিধ কারন রয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতাসহ বিকশিত হওয়ার অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে মেধাবী তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মের বিদেশমুখীতার সামাজিক কারণের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নত পরিবেশে জীবন যাপনের আশা, উচ্চ বেতন বা আয়ের সুযোগ প্রাপ্তি, শিক্ষা বা গবেষণা শেষে ভালো চাকুরির প্রস্তাব, চাকুরির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নমনীয়তা অপেক্ষাকৃত বেশি পাওয়া, সন্তান তথা পরিবারের জন্য উন্নত দেশে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ইচ্ছা, জীবনের নিরাপত্তা(বিদ্বেষ, আক্রমণ, হত্যা ইত্যাদি থেকে) অধিক থাকা প্রধান।

শিক্ষাক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস, ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষকদের রাজনীতি, অতি দলাদলী, যৌন হয়রানিসহ নানাবিধ কারণে মেধাবীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। গবেষণার বিস্তৃত ও নিরবচ্ছিন্ন সুযোগ থাকা, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা পাওয়া, শিক্ষা ও গবেষণার কাজে অত্যাধুনিক সরঞ্জামের সহজ প্রাপ্যতা, সহকর্মী বা রিসার্চ ফেলো এবং প্রতিষ্ঠান থেকে সামগ্রিক ও মানসিক সহযোগিতা প্রাপ্তি, ভালো কাজের স্বীকৃতি পাওয়া, নামী ও বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন/অধ্যাপনা/গবেষণা করার আত্মতৃপ্তি লাভের আশাও দেশের বিশাল মেধাবী জনসম্পদকে বিদেশমুখী করে তুলেছে।

এছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হওয়া, কর্মক্ষেত্রে কাঙ্খিত পদমর্যাদা/ পদোন্নতি/ যথাযোগ্য সন্মান না পাওয়া, চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়া; দেশের প্রতি মমত্ববোধ না থাকা, দেশের জন্য কাজ করার/উন্নয়নে অবদান রাখার মানসিকতা না থাকা, সুন্দরী বিদেশি মেয়ের প্রেমে পড়া/বিয়ে করে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ অথবা জীবনসঙ্গী অন্য দেশের নাগরিক হওয়ার জন্যেও মেধা পাচারের ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চ-শিক্ষার্থে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। UNESCO এর ‘Global flow of tertiary level students’ বিষয়ক এক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ৫৭৬৭৫ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়। যাদের মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই আর ফিরে আসছেন না। অথচ এই কৃতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সমাপনে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। উল্লেখ্য সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রীপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর পিছনে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৫ লাখ টাকার অধিক, একজন বুয়েটের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে যা ১০ লাখ টাকা আর একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকার উপর। আবার, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করাতে জনপ্রতি সরকারের গড় খরচ আরো প্রায় ১০ লাখ টাকা করে! শিক্ষার্থীদের পেছনে দেশের এই বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। অথচ এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও মেধার সুফল ভোগ করছে উন্নত বিশ্ব।

আন্তর্জাতিক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল এই তিরিশ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা অনুন্নত বিশ্ব থেকে এক মিলিয়ন কারিগরি ও পেশাদার ব্যক্তি গ্রহণ করেছে। পরবর্তী সময়ে মেধাবী জনসম্পদের উন্নত বিশ্বে অভিবাসন নি:সন্দেহে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উন্নত দেশগুলো দারুনভাবে লাভবান হচ্ছে। প্রথমত, তারা বিনা খরচে অনুন্নত বিশ্বের বিজ্ঞানী ও দক্ষ জনশক্তি পাচ্ছে যা দিয়ে তাদের নিজস্ব ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অপেক্ষাকৃত কম বেতনে এদের উদ্ভাবনী শক্তি ব্যবহার করে অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত করা যাচ্ছে। অপর দিকে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনুন্নত বিশ্ব।

বাংলাদেশের সর্বত্রই যেমন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতাকে সম্মান ও পুরস্কৃত করার পরিবর্তে মেধাহীন, অদক্ষ, কর্মবিমুখ ও চাটুকারদের পুরস্কারের সংস্কৃতির শিকড় গেড়েছে; বিজ্ঞান-গবেষনায় নিয়োগ ও পদন্নোতিতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। উদাহরনস্বরূপ- ২০০১ সালে বাংলদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটে (বিএআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষায় ৩২টি পদের বিপরীতে মন্ত্রীদের সুপারিশই ছিলো ৪৬ জন প্রার্থীর অনুকুলে। এই একই প্রতিষ্ঠান থেকে হতাশা, বঞ্চনা এবং পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা না পেয়ে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক ১১৫ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষক চাকুরী ছেড়েছেন। তাদের অর্ধেকেরও বেশি পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে!

আমাদের দেশে মেধাবীদের মূল্যায়ন না করা, গবেষকদের প্রতি অবহেলা, সামগ্রিকভাবে শিক্ষা খাতকে যে দৃশ্যত গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা তাদের ছেলে মেয়েরা এদেশে পড়ে না। দেশের ৭৪% রাজনৈতিবিদদের সন্তান পড়াশোনা করে বিদেশে।

দেশের মেধা পাচার সম্পূর্ণভাবে রোধ করা কখনোই সম্ভব নয় তবে সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করে তা কমিয়ে আনা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে- বিশেষ মেধা ও যোগ্যতা সম্পন্নদের জন্য বিশেষ উচ্চ বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা, উন্নত আবাসন(বাড়ি,গাড়ি), উন্নত কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্র‌যোজ্য ক্ষেত্রে পেশাগত নমনীয়তা প্রদান; যেমন- আর্কিটেক্ট, ডিজাইনার ইত্যাদি ক্ষেত্রে চাইলে ঘরে বসে অফিস করতে পারার সুযোগ রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ও সুবিধাদির নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবে-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধা ভিত্তিক ছাত্র ভর্তি এবং মেধাবী শিক্ষক, গবেষক নিয়োগ, শিক্ষা ও গবেষণায় আলাদা উচ্চ বাজেট প্রনয়ন এবং তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, বিশ্বমানের আধুনিক গবেষণার স্থাপন, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন এবং সবশেষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা স্বনামধন্য মেধাবী পেশাজীবিদের এবং ছাত্রদের দেশে ফিরিয়ে এনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে।